Friday, March 12, 2010

মাষ্টার মহাশয় (৩য় অংশের পর)

সেগুলি তাহাদিগকে বিনামূল্যেই দেওয়া হইতে লাগিল।

গেীঁসাইঞ্জের লোকের সঙ্গে নন্দীপুরের লোকের পথে-ঘাটে দেখা হতেই উভয় গ্রামের মাষ্টার সম্বন্ধে আলোচনা হইত। গেীঁসাইগঞ্জ বলিত বর্ধমানের মাষ্টার, ও জানেই বা কি, পড়াবেই বা কি? নন্দীপুর বলিত হলই বা আাদের মাষ্টারের বর্ধমানে বাড়ি, তিনিও কলকাতাতেই লেখা পড়া শিখেছেন। ওরা যখন পড়তেন তখন কি বর্ধমানে ইংরেজী ই্কুল ছিল?

গেীঁসাইগঞ্জ একটি কথা শুনিয়া উদ্বিগ্ন হইায় উঠিল। নন্দীপুরের মাষ্টার নাকি বলিয়াছেন, ঐ বেটা বুঝি ওদের মাষ্টার হয়ে এসেছে, তা এদিন জান তাম না, ওটাত মহা মূর্খ। ছেলেবেলায় কলকাতায় আমরা এক-কেলাসে পড়তাম কি না। আমরা যখন সেকেন বুক পড়ি সেই সময় ও ইস্কুল ছেড়ে দেয় তারপর ও আর ইংরেজী পড়েনি। বড় বাজারে এ মহাজনের আড়তে খাতা লিখত , মাইনে ছিল সাত টাকা। গেীঁসাইগঞ্জবাসী ব্রজ মাষ্টারকে আসিয়া জিঞ্জাস করিল, এ কি শুনছি?

ব্রজ মাষ্টার প্রশ্ন শুনিয়া হসিয়া উঠিলেন, বলিলেন এ কেই বলে কলিকাল। সেকেন বুক পড়ার সময়ে আমি ইস্কুল ছেড়ে দিয়েছিলাম, না কি ওই ছেড়ে দিয়েছিল? মাষ্টার ওকে একটা 'কোরশেন' জিঞ্জাস করলে, ও এনসার করতে পারলে না। আমায় জিঞ্জাস করতেই আমি বললাম। মাষ্টার আমায় বলল, দাও ওর কান মলে। আমি কান মলে দিতেই ও মুখ চোখ রাগে রাঙ্গা হয়ে গেল। ও বলতে লাগল, আমি হলাম বামুনের ছেলে, ও কায়েত হয়ে কিনা আমার কানে হাত দেয়। সেই অপমানে ও-ই-ত ইস্কুল ছেড়ে দিল।

উভয় মাষ্টারের পরস্পরের প্রতি এই তীব্র অপবাদ-প্রয়োগের ফল.......................................(চলবে)

Tuesday, March 9, 2010

মাষ্টার মহাশয় (২য় অংশের পর)

দেখাগেল পিল পিল করিয়া লোক সদর দরজা দিয়া প্রবেশ করিতেছে। রামচরণ পথে আসিতে আসিতে , নন্দীপুরের হস্তে গেীঁসাইগঞ্জের এই অভূতপূর্ব পরাভব-সংবাদ প্রচার করিয়া আসিয়াছিল। সকলেই চিৎকার করিয়া নানা ছন্দে বলিত লাগিল, এ কি সর্বনাশ হল। নন্দীপুরের হাতে এই অপমান। আমাদে ইস্কুল খোলবার কি উপায় হবে?



হীরু দত্ত সেই রোয়াকের বারান্দায় দাঁড়াইয়া বলিতে লাগিলেন।

ভাই সব! তোমর কি মনে করেছ তিন পুরুষের পর আজ গেীঁসাইগঞ্ঝ নন্দীপুরের কাছে হটে যাবে? কখনই না এদেহে প্রাণ থাকতে নয়। আমরাও ইস্কুল খুলবো। ওরা বা কি ইস্কুল খুলেছে, আমরা তার চতুর্গুন ভাল ইস্কুল খুলবো। আমি কলিকাতা গিয়ে ওদের চেয়ে ভাল মাষ্টার নিয়ে আসব। ওরা পনের টাকা দিয়ে মাষ্টার এনেছে, আমরা পঁচিশ টাকা মাইে দেব। আজ থেকে এক হপ্তার মধ্যে, আমরা এই চিগুীমন্ডপে ইস্কুল বসাবো বসবো বসাবো- তিন সত্য করলাম। এখন যাও, তোমরা বাড়ি যাও, স্নানাহার করগে।



জয় গেীঁসাইঞ্জের জয়। জয় হীরু দত্তের জয়। সোল্লাসে সেই জনতা প্রস্তান করিল।



মাষ্টার মহাশয়ের নাম ব্রজগোপাল মিত্র । বয়স ত্রিশ বছর, খর্বাকার, কৃশকার ব্যক্তি বড় মিষ্টভাষী। ইরেজীটা তাহার এতই বেশি অভ্যাস্ত হইয়া পরিয়া ছিল যে, লোকের সঙ্গে আলাপ করিতে করিতে মাঝে-মাঝে ইরেজী কথা মিশাইা ফেলেন। মাষ্টার মহাসয়ের মুখে এই রূপে কথাবার্তা শুনিয়া লোক জন একেবারেই মোহিত হইা গেল।


হীরু দত্তের প্রতিঞ্জা অনুসারে পরদিনই ইস্কুল খুলিল। পনের ষোলটি ছাত্র লইয়া মাষ্টার মহাশয় অধ্যাপনা শুরু করিলেন। কলিকাতা হইতে তিনি প্রচুর পরিমনে সেলেট, পেন্সিল ও মরে সাহেবের 'স্পেলিং বুক' পুস্তক খরিদ করিয়া আনিয়া ছিলেন। ছা্ত্রদের উৎসাহ বর্ধনার্থে সেই......................................(চলবে)

Monday, March 8, 2010

মাস্টার মহাশয় (১ম অংশের পর)

রামাচরন দুই চক্ষু কপালে তুলিয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল, কি হয়েছে জিঞ্জাস করছেন দত্তজা, কি হতে বাকী আছে ? হায় হায় হায় কার্তিক মাসে যখন আমার জ্বরবিকার হয়েছিল, তখনই আমি গেলাম না কেন? এই দেখবার জন্য কি আমায় বাঁচিয়ে রেখেছিল, হা-রে বিধাতা, তোর পোড়া কপাল।

শ্যামাপদ ও কেনারাম ঘোর দুশ্চিন্তায় রামচরণের পানে চাহিয়া রহিল। দত্তজা বলিলেন, কি হয়েছে, কি হয়েছে? সব কথা খুলে বল। এখন আসছ কোথা থেকে?

দীর্ঘ নিঃশ্বাস-জড়িত স্বরে রামচরণ উত্তর করিল, নন্দীপুর থেকে। হায় হায় শেষ পর্যন্ত নন্দীপুরের কাছে মাথা হেট হয়ে গেল। হা-রে কপাল। বলিয়া রামচরণ সজোরে নিজ ললাটে করাঘাত করিল।

দত্তজা জিঞ্জাস করিলেন, কেন কেন? নন্দীওয়ালারা কি করেছে?

বলছি। বলার জন্যই এসেছি। এই রোদ্দুরে মশাই এক কোষ পথ ছুটতে ছুটতে এসেছি। গলাটা শুকিয়ে গেছে, মুখ দিয়ে কথা বেরুচ্ছে না। এক ঘটি জল-

দত্তজার আদেশে অবিলম্বে এক ঘড়া জল এবং একটি ঘটি আসিল। রামচরণ উঠিয়া রোয়াকের প্রান্তে বসিয়া, সেই জলে হাত মুখ পা ধুইয়া ফেলিল, কিঞ্চিৎ পানও করিল। তার পর হাত মুছিতে মুছিতে নিকটে আসিয়া, গম্ভির বিষাদে মাথাটি বাঁকাইয়া রহিল।

দত্তজা বলিলেন, এবার বল কি হয়েছে, আর দগ্ধে মেরো না বাপু !

রামচরন বলিল, কি হয়েছে। যা হবার নয়, তাই হয়েছে । বড় বড় শহরে যা হয়না, নন্দীপুরে তাই হয়েছে। এসব পাড়াগাঁয়ে কেউ কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি, তাই হয়েছে। তারা ইস্কুল বসিয়েছে। আরে ছাই আমি কি জানতাম আগে? আজ না শুনলাম-ইঞ্জিরি পড়ার পাঠশালাকে ইস্কুল বলে।

দত্তজা বলিলেন, ওঃ ইস্কুল খুলেছে বুঝি? -তা মাস্টার কোথা থেকে এনেছে, কিছু শুনলে?

সব খবরই নিয়ে এসেছি। বর্ধমান থেকে এনেছে। বামুনের ছেলে-হারান চক্রবর্তী। পনের টাকা মাইনে, বাসা, খোরাক লাগবেনা। সব খবরই নিয়ে এসেছি।

বাহিরে এসময় একটা কোলাহল শুনাগেল। পরক্ষনেই.........................(চলবে)

Sunday, March 7, 2010

মাষ্টার মহাশয়

। (প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়)

কিঞ্চিতাধিক পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে, শহর হইতে ষোল ক্রোশ দূরে দামোদর নদের অপর পারে নন্দীপুর ও গেীঁসাইগঞ্জ নামক পাশাপাশি দুইটি বর্ধিঞ্চু গ্রাম ছিল। উভয় গ্রামের সীমারেখার উপর একটি প্রাচীন সুবৃহৎ বটবৃক্ষ ছিল। এখন সে গ্রাম দু'খানিও নাই, বটবৃক্ষটিও অদৃশ্য-দামোদরের বন্যা সে সমস্ত ভাসাইয়া লইয়া গিয়েছে।

ফাল্গুন মাস, এক প্রহর বেলা হইয়াছে। গেীঁসাইগঞ্জরে মাতব্বর প্রজা এবং গ্রামের অভিভাবক-স্তানীয় কায়স্ত-সন্তান শ্রীযুক্ত হীরলাল দাস মহাশয় হুঁকা হাতে করিয়া ধুমপান করিতেছিলেন। প্রতিবেশী শ্যামাপদ মুখুয্যে ও কেনারাম মল্লিক (ইহারাও বড় প্রজা) নিকটে বসিয়া এ বৎসর চৈত্রমাসে বারোয়ারী অন্নপূর্ণা পূজা কিরূপভাবে নির্বাহ কারিতে হইবে তাহারই পরামর্শ করিতেছিলেন। পাশ্ববর্তী নন্দীগ্রামেও প্রতি বৎসর চাঁদা করিয়া ধূমধামের সহিত অন্নর্পূণাপূজা হইয়া থাকে। গেীঁসাইগঞ্জের বাসিগনের একবাক্যে ইহাই মত যে, তিন পুরুষ ধরিয়া গেীঁসইগঞ্জ কোন বিষয়েই নন্দীপুরের নিকট হটে নাই- এবং আজিও হটিবে না।

আগামী বারোয়ারী পূজা সম্বন্ধে যখন গ্রামস্ত তিনজন প্রধান ব্যাক্তির মধ্যে গভীর ও গুঢ় আলোচনা চলিতেছিল সেই সময়ে রামচরণ মন্ডল হাঁপাইতে হাঁপাইতে সেইখানে আসিয়া পেীঁছাইল এবং হাতের লাঠিটা আছড়াইয়া ফেলিয়া দপাস করিয়া মাটিতে বসিয়া পড়িল। তাহার ভাব ভঙ্গি দেখিয়া হীরু দত্ত সভয়ে জিঞ্জাসা করিলেন, কি হে মোড়লের পো, অমন করে বসে পড়লে কেন? কি হয়েছে?...... (চলবে)